শিরোনাম
চৌমুহনীতে দুই সেমাই কারখানাসহ পাঁচ প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা চাটখিলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যুবদল নেতা গ্রেফতার কাল থেকে সীমিত পরিসরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট টেস্ট জয়ের লক্ষ্যেই আমরা শ্রীলংকা এসেছি: মোমিনুল নোয়াখালীতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক গুলিবিদ্ধ গত ২৪ ঘন্টায় নোয়াখালীতে ৮১ জনের করোনা শনাক্ত রাজধানীতে মাওলানা আবদুর রশিদ ফাউন্ডেশনের রমাদান মাসব্যাপী খাবার বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঈদ উপহার পাবে ৩৬ লাখ ২৫ হাজার পরিবার : ওবায়দুল কাদের দেশে করোনায় একদিনে সর্বোচ্চ ১০২ জনের মৃত্যু
বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

করোনা আক্রান্ত বা অসুস্থ ও মৃত ব্যক্তির প্রতি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর কর্তব্য

রিপোটারের নাম / ১৫৭১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

মানুষ আশ্রাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা, এই জন্য মৃত্যুর পরও মানুষকে সম্মানের সাথে দাফন-কাফন বা সমাহিত করতে হয়। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের দায়িত্ব পরিবার -পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর উপর ফরজে কেফায়া। কিন্তু বর্তমান করোনা সংকটে বিশ্বব্যাপি এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়েছে। যা আশ্রাফুল মাখলুকাত হিসাবে মানুষের জন্য বেমানান, লজ্জাকর। মানুষের কর্তব্য হিসেবে এটি পালনের প্রতি ইসলাম এমন জোর তাকিদ দিয়েছেন, যে আল্লাহর ইবাদতের পরেই পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর হক আদায়ে ইসলাম বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান করেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

واعبدو الله ولا تشركوا به شيئا وبالوالدين احسانا  وبذى القربى واليتمى والمساكين والجارذى القربى والجار الجنب والصاحب بالجنب وابن السبيل 

অর্থঃ আল্লাহ তায়ালা  ইরশাদ করেন- তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও তাঁহার সাথে কাউকে শরীক করোনা, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকীন, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পথচারীসঙ্গী ও পথিকের সাথে সদাচরণ কর । (সুরা নিসা- ৩৬)

করোনা মহামারি আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য তারবিয়াতের একটি পাঠ। যারা তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের ভুল-ত্রুটি শুধরিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনে সচেষ্ট হবে। এই মুসিবতের সময় ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাস করে ইমান হারা না হয়ে ইমানের উপর দৃঢ় থেকে নিজেকে শুধরিয়ে নিতে পারবে। তারাই আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বিপদ মুক্তির আশা করতে পারে ।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- 

-ظهر الفساد فى البر والبحر بما كسبت ايدى الناس ليذيقهم بعض الذى عملوا لعلهم يرجعون

অর্থঃ স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, এই জন্য যে,আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের (কিয়দাংশ) শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (পাপ কাজ থেকে) ফিরে আসে। সূরা আররূম -৪১

অতএব করোনা বিষয়ে এমন কোন ধ্যান-ধারণা বা বিশ্বাস পোষণ করা যাবেনা যাহা ইসলাম সমর্থন করেনা।  ইসলাম মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে তা পালনে কোন প্রকার অবহেলা বা পিছপা হওয়া যাবেনা।  

ইসলাম শান্তির ধর্ম। বিশ্ব শান্তির প্রতিই ইসলামের আহবান।  বিশ্ব শান্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে মানুষে মানুষে  ভ্রাতৃত্ব, সাম্য-মৈত্রি ও পরস্পর সহানভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়া।

হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই মিশন নিয়েই কাজ করেছেন।

তাইতো ইসলাম আল্লাহর ইবাদতের পরই মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।

 বিশ্ব শান্তি , পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ও শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষের প্রতি মানুষের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করা অপরিহার্য।

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রির বন্ধন দৃঢ় করার জন্য পরস্পর ছয়টি  কর্তব্য পালনের নির্দেশ দিয়েন।  

عن ابى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم حق المسلم على المسلم ست …. اذا لقيته فسلم عليه واذا دعاك فاجبه واذا استنصحك فانصح له واذا عطس فحمد الله فشمته واذا مرض فعده واذا مات فاتبعه

হাদীসটি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)  রাসুল (সঃ)  থেকে বর্ণনা করেন- যাতে মানুষের প্রতি মানুষের ছয়টি  কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে।

(১) সাক্ষাতে পরস্পর সালাম বিনিময় করা।

(২) দাওয়াত গ্রহণ করা 

(৩) অপরের কল্যাণ কামনা করা   

(৪) হাঁচির উত্তর দেয়া 

(৫) অসুস্থ ব্যক্তির শয্যা পাশে গিয়ে তার খোজ খবর নেয়া এবং সেবা করা

( ৬)) মৃত ব্যক্তির জানাযায় ও দাফন-কাফনে অংশ গ্রহণ করা।  ( সহীহ মুসলিম)

বর্তমান করোনা মানুষকে এই সকল নেক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ অপরের প্রতি নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে যেতে বসেছে। যার কারণে আজ পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন হুমকির মুখে। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রির বন্ধন আজ বিপর্যস্ত। 

সমাজের মানুষ আজ করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবার পরিবর্তে তাকে ভয়, ঘৃণা, হিংসা করছে।  অনেক স্থানে বিষ পানে আত্ম হত্যার প্রতি প্ররোচনা দিচ্ছে। মৃত ব্যক্তিকে আপন জনেরা গ্রহণ করছেনা । যে মা-বাবা নিজের জীবন দিয়ে সন্তানের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতেন, সে মা-বাবা আজ সন্তানের কাছে যাচ্ছেনা, সন্তানের লাশ গ্রহণ করছেনা। যে সন্তান মা-বাবার সকল সম্পদ ভোগ করবে, সে সন্তান মা-বাবাকে রাস্তায় বা জঙ্গলে ফেলে অথবা মা-বাবার লাশ ফেলে পালিয়ে যায়। প্রতিবেশীরা লাশ এলাকায় দাফন করতে দিচ্ছেনা। যা মানবতার চরম বিপর্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ স্বাস্থ্য বিভাগ বার বার বলে আসছে যে, করোনা ভাইরাস মৃত ব্যক্তি থেকে ছড়ায়না।

মৃতের গোসল দান ও দাফন-কাফনের মর্যাদা সম্পর্কে  রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেন-

عن ابى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من اتبع جنازة مسلم ايمانا واحتسابا وكان معه حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فانه يرجع من ا لاجر بقيراطين كل قيراط مثل احد ومن صلى عليها ثم رجع قبل ان تدفن فانه يرجع بقيراط – متفق عليه

অর্থঃ হযরত আবু হুরাইরা (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি ইমানের সাথে সওয়াবের আশায় কোন মুসলমানের লাশের কাছে যায় এবং তার জানাযার নামাজ পড়া ও দাফন-কাফন হওয়া পর্যন্ত তার সাথেই থাকে। তাহলে সে দুই কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে।  প্রত্যেক কীরাত হচ্ছে উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ। আর যে ব্যক্তি জানাযার নামাজ পড়ে দাফন করার পূর্বে ফিরে আসে। সে এক কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে। (বুখারী ও মুসলিম)

 আশঙ্কার  কথা হচ্ছে, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সাথে বিগত কয়েক মাসের মত অবস্থা চলতে থাকলে করোনা পরবর্তি সময়ে আমরা পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনহীন মনুষ্যত্বহীন এক বিশ্বেকে দেখতে পাবো। যাতে সভ্য মানুষের বসবাস দুরূহ হয়ে পড়বে।

এই করোনা কালে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে করোনাকে ভয় করছে। অথচ ইমানদারের উচিৎ করোনাকে ভয় নই , বরং একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা। কারণ করোনাতো আল্লাহর হকুমেরই অনুগত। তার ইচ্ছার বাহিরে কোন শক্তি নাই যে, সে কাউকে আক্রমন করবে, কারো সামান্যতম ক্ষতি করবে। যেমন আগুনের ধর্ম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করা। কিন্তু আল্লাহর হুকুম না থাকায় ইবরাহিম (আঃ) এর একটি পশম ও আগুন জ্বালাতে পারেনি।

তাই আসুন আমাদের সর্তকতা অবলম্বন করে রুগ্ন ব্যক্তির সেবায় এগিয়ে যেতে হবে। অন্যান্য মৃত ব্যক্তির মত করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সম্মানের সাথে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। মৃত ব্যক্তির পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের সাথে সহনশীল আচরণ করতে হবে।  

রাসূল (সঃ) বলেন-

عن عبد الله بن عمرو (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم  الراحمون يرحمهم الرحمن ارحموا من فى الارض يرحمكم من فى السماء  – الترمذى

অর্থঃ হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেনে- দয়াবান ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ রাহমানুর রহিম দয়া করেন। অতএব তোমরা জগৎ বাসীর প্রতি দয়া কর তাহা হলে আসমানের মালিক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।( তিরমিযি)

রাসূল (সঃ) আরো বলেন-

عن جرير بن عبد الله (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يرحم الله من لا يرحم الناس – متفق عليه

অর্থঃ হযরত জারীর বিন আবদুল্লাহ (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেনে- যে মানুষের প্রতি দয়া করেনা আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেননা। (বুখারী ও মুসলিম)

কিয়ামত দিবসে মানুষ যখন একটি মাত্র নেক আমলের জন্য পেরেশান হয়ে যাবে,  মা-বাবা, স্ত্রী ,সন্তান কেউ তাকে সাহায্য করবেনা। তখন মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনে এত সওয়াবের পর ও করোনার অজুহাতে আমরা কি করি এমন নেক আমল থেকে দূরে থাকি। এর চেয়ে বড় হতভাগা আর কে হতে পারে?  

আসুন বিশ্ব শান্তি , পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন টিকিয়ে রাখতে এবং পরকালে মুক্তির আশায় ইসলাম নির্দেশিত মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করি। বিশেষ করে করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা ও মৃত ব্যক্তির দাফন কাফনে নির্ভয়ে কাজ করি। হে অল্লাহ আমাদের পাপ ক্ষমা  করে, বিশ্বকে করোনাসহ সকল আযাব-গজব থেকে নাযাত দাও। (আমীন)

লেখকঃ ইমাম ও খতীব, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ